ভারতীয় পণ্যের ওপর গত আগস্টে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পর থেকে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে ও বিকল্প বাজারে প্রবেশে তৎপর রয়েছেন দেশটির রফতানিকারকরা। এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ভারত সরকার। রফতানিকারকদের সহায়তার পাশাপাশি দ্রুত নতুন বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন। খবর এফটি।
বিশ্বের সর্ববৃহৎ বেড লিনেন প্রস্তুতকারক মুম্বাইভিত্তিক ইন্দো কাউন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ। ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার পর থেকে কোম্পানিটি নতুন গ্রাহকের খোঁজে ফ্রান্স থেকে শুরু করে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত বিভিন্ন বাজারে প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে।
ইন্দো কাউন্টের বেডশিট বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়াল মার্টের মতো মার্কিন ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। এখন তিন বছরের মধ্যে দেশটিতে রফতানি অর্ধেকের কমে নামাতে চায় কোম্পানিটি। ইন্দো কাউন্টের সিএফও মনিশ ভাটিয়া বলেন, ‘আমাদের বৈচিত্র্য আনতে হবে। আপনি এক দেশেই নির্ভর করতে পারবেন না।’
রফতানিকারকদের এ ধরনের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারি নানা উদ্যোগ। আজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণা করতে পারে ভারত। গতকাল ইউরোপীয় গাড়ির ওপর থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। মনিশ ভাটিয়া আশা করছেন, ব্রাসেলসের সঙ্গে চুক্তি ইন্দো কাউন্টকে পুরো ব্লকে প্রবেশের সমান সুযোগ দেবে।
ভারত এখনো আশা করছে, ট্রাম্প আরোপিত শুল্ক কমে আসবে। কিন্তু ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ধীরগতির মাঝে মোদি প্রশাসন দ্রুত গতিতে বেশকিছু বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করছে। দেশটির ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপ বিরল। ভারত সাধারণত অভ্যন্তরীণ বাজারের সুরক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেয়। গত মাসে নিউজিল্যান্ড ও ওমানের সঙ্গে চুক্তি করেছে দেশটি।
ভারতের রফতানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিমাণ ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এরপর সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) হিস্যা ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে শুল্ক বাধার মুখে এরই মধ্যে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী পণ্যপ্রবাহ কমেছে। বিপরীতে হংকং, থাইল্যান্ড ও ইউএইতে রফতানি বাড়ছে। এমনকি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় গত ডিসেম্বরে চীনে ভারতীয় পণ্য রফতানি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বেড়েছে।
সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংক অব বরোদার তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বরে ভারত থেকে অন্যান্য দেশে রফতানি ১২ হাজার ১৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৪০ কোটি ডলার বেশি। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থনীতিবিদ মদন সাবনাভিস বললেন, ‘মার্কিন শুল্ক বাড়ায় রফতানিকারকরা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকতে কেউ কেউ খরচ কমানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক কম এমন তৃতীয় দেশগুলোর মাধ্যমে পুনঃরফতানি হচ্ছে।’
আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানোর চেষ্টায় ছিল পূর্ব ভারতের চিংড়ি সরবরাহকারী এপেক্স ফ্রোজেন ফুডস। ট্রাম্প শুল্ক আরোপের পর সে উদ্যোগ গতিশীল হয়েছে বলে জানান কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক করুতুরি চৌধুরী। তিনি আশা করছেন, সম্প্রতি উন্মুক্ত বাজারে কোম্পানির বিক্রি বাড়বে। গত সেপ্টেম্বরে ইইউতে রফতানির অনুমতি পেয়েছে কোম্পানিটি। পরের মাসে ভারতীয় চিংড়ির ওপর থেকে আট বছরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় অস্ট্রেলিয়া। এছাড়া রাশিয়ায় রফতানির জন্য অনুমোদন পেতে অপেক্ষা করছে এপেক্স।
এদিকে মনিশ ভাটিয়া জানান, বেড লিনেন ব্যবসা মার্কিন গ্রাহকদের ওপর পুরো শুল্কের খরচ চাপায়নি ইন্দো কাউন্ট। ফলে বিক্রির বড় ধরনের পতন থেকে রক্ষা পেয়েছে কোম্পানি। তবে সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া প্রান্তিকে বিক্রি কমেছে ৯ শতাংশ।
ইন্দো কাউন্ট এখন বিভিন্ন দেশের ক্রেতা রুচি অনুযায়ী ডিজাইনার নিয়োগ করেছে। আশা করছে, ভারত-যুক্তরাজ্য চুক্তি অনুমোদন হলে ব্যবসা বাড়বে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও জাপানে রফতানি বাড়াচ্ছে কোম্পানিটি।
বিদেশে থাকা কূটনৈতিক মিশনকে নতুন বাজারের খোঁজে সরাসরি চাপ দিচ্ছে মোদি প্রশাসন। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মার্কিন বাজারের বিকল্প খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় বাস্তবিক প্রেরণা দিচ্ছে ট্রাম্পের শুল্ক। আমাদের বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত এমন ১০টি বাজার চিহ্নিত করা হয়েছিল প্রথমে। পরে তা ৪০-এ উন্নীত করা হয়।’
বার্কলেসের অর্থনীতিবিদদের মতে, নিজেদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ হিস্যা রয়েছে এমন দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে ভারত। এসব প্রচেষ্টা মার্কিন বাজারের রফতানি হ্রাস পূরণ করতে পারবে কিনা স্পষ্ট নয়।
গবেষণা সংস্থা এশিয়া ডিকোডেডের প্রতিষ্ঠাতা প্রিয়াংকা কিশোরের মতে, বিদ্যমান মার্কিন শুল্কের প্রভাবে ভারতের জিডিপি প্রায় দশমিক ৪ শতাংশ কমবে। সময়ের সঙ্গে কর্মসংস্থান, ভোগ ও বিনিয়োগ খাতে এর প্রভাব বাড়বে।
এখন ভারতের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা দ্রুত সমাপ্তির দিকে নজর রাখছেন রফতানিকারকরা। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক দাবি করেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে মোদি যোগাযোগ না করার কারণে গত বছর প্রায় সম্পন্ন চুক্তি ব্যর্থ হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রিয়াংকা কিশোর বলেন, ‘লুটনিকের মন্তব্য বিষয়টিকে দুজনের মধ্যে কথোপকথনে নামিয়ে এনেছে। সাধারণত এ ধরনের আলাপ খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে তা সত্যিই কঠিন।’